সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯, ০৯:২২:৩৫
সংবাদ শিরোনাম
 
জাদুঘরে যাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহাসিক নিদর্শন ঢোপকল
Online Desk | প্রকাশ: ০৯:১১, রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানার পূর্বপ্রাচীর ঘেঁষে রয়েছে একটি ঢোপকল। এক সময় বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির একমাত্র উৎস হিসেবে এই ঢোপকল ব্যবহার হয়েছে। তবে এখন এই ঢোপকল দিয়ে আর পানি বের হয় না। তাই ঢোপকলের জায়গাটি ঘিরে স্থানীয় নগেন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছেন চা- সিঙ্গারার দোকান।

 

জানতে চাইতেই নগেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আগে কত সহজে পানি পাওয়া যেতো। গরীব মানুষের কত উপকার হতো, এখন আর পানি আসে না। গরমের দিন পানির জন্য গরীব মানুষ হাহাকার করে মরে।’


পুঠিয়ার মহারানীর হেমন্ত কুমারীর আর্থিক সহায়তায় ১৯৩৭ সালের বসানো হয়েছিলো ঢোপকল। তখন এই ঢোপকলের মাধ্যমেই রাজশাহী মহানগরীর মোড়ে মোড়ে পৌছে যেতো বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু আধুনিক যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারছে না ঐতিহ্যের ঢোপকলগুলো। রাস্তা সম্প্রসারনসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা পড়ছে ঢোপকল। ফলে ঐতিহ্য হারাচ্ছে রাজশাহী। স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এখন জাদুঘরে স্থান মিলেছে ঢোপকলের।


রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য অনেক ঢোপকল ভেঙ্গে ফেলতে হয়েছে। তাছাড়া আধুনিক যুগে প্রায় সব বাড়িতেই পানি সরবরাহ আছে। যেকারণে এর ব্যবহার খুব বেশি হয়না।’ তিনি বলেন, ‘ঢোপকল আর ব্যবহারের জন্য নগরীতে রাখা হবে না। এর ভেতরে শ্যাওলা জমে যায়। পানি পড়ে ফুটপাত নষ্ট হয়। তাই একে এখন শুধু প্রদর্শণীর জন্য রাখা হবে। বরেন্দ্র জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য দুটি, সিএন্ডবি মোড় থেকে ডিআইজি অফিস পর্যন্ত প্রদর্শনীর জন্য তিনটি এবং কাজলায় মাহবুর রহমানের আর্কাইভে একটি রাখা হয়েছে। কিছু ঢোপকল পার্কেও প্রদর্শণীর জন্য দেয়া হবে। এগুলো আর ব্যবহার করা হবে না।’

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান রায় ডি এন দাশগুপ্ত (১৯৩৪-৩৯) থাকাকালীন তিনি রাজশাহী এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় নগরবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন। সে সময় পুঠিয়ার মহারানী ছিলেন হেমন্ত কুমারী।

 

রাজশাহী এসোসিয়েশন মহারাণী হেমন্ত কুমারীসহ অন্যান্য দানশীল ব্যক্তিকে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। তখন হেমন্তকুমারী একাই ৬৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। বিশাল অংকের একক অনুদানের কারণে রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে মহারাণী হেমন্তকুমারীর নামেই ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপিত হয়। সেই সময় ঢোপকলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাইপগুলো ছিল কাস্ট আয়রণের এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলি পিতলের তৈরি ছিল। সিমেন্টের তৈরি ঢোপকলগুলো ছাড়া অন্য সবকিছু ইংল্যান্ড থেকে প্রস্তুত করে আনা হয়।

 


সেই সময় হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস-এ প্রতিদিন ৭০০ মিটার কিউব ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধন করা যেতো। এই পানি শোধন কেন্দ্রে ধাতব পদার্থ আয়রণ, ম্যাঙ্গানিজ ও পানির ক্ষরতা দূর করার ব্যবস্থা ছিলো। এই শোধন করা পানি নগরীর মোড়ে মোড়ে পৌছে দিতে তখন ১০০ টিরও বেশি ঢোপকল স্থাপন করা হয়। রাজশাহীবাসী দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর মহারাণী হেমন্তকুমারীর সেই ওয়াটার ওয়ার্কস থেকে বিশুদ্ধ পানি পেয়েছেন।

 

এই ঢোপকলগুলির প্রতিটির পানি ধারণ ক্ষমতা ৪৭০ গ্যালন। প্রতিটি ঢোপকলেই ছিল একটি ‘রাফিং ফিল্টার’। এতে বালি ও পাথরের স্তর থাকায় সরবরাহকৃত পানি আরও পরিশোধিত হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যেতো। সেই সময় সারাদিনে মাত্র দুই ঘন্টা পানি সরবরাহ করা হত। এজন্য প্রতিটি ঢোপকলকে পানি রিজার্ভ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হত। ফলে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। এ ধরণের সুষ্ঠু ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশের মধ্যে শুধু রাজশাহী পৌরসভা ও দিনাজপুর জেলায় কিছু পরিমাণে ছিল। এছাড়া পশ্চিমবাংলার মালদহ জেলায় এ ধরণের ঢোপকল ছিল।


গত কয়েক বছর ধরে রাস্তা সম্প্রসারণসহ উন্নয়নমূলক কাজের অজুহাতে রাজশাহীর এসব ঐতিহ্যবাহী ঢোপকলগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে। গত এক যুগে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে প্রায় ৬০টি ঢোপকল।


রাজশাহী ওয়াসার সহকারি প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান সিল্কসিটি নিউজকে  জানান, শুরুতে নগরীতে শতাধিক ঢোপকল ছিলো। বর্তমানে ৪৭ টি ঢোপকল রয়েছে। এর মধ্যে পানি সরবরাহ চালু আছে ৩৩টিতে। অন্যগুলো অকেজো হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ওয়াসার পানি রাজস্বের বিনিময়ে দেয়া হয়। ঢোপকল থেকে কোন রাজস্ব আসে না। তারপরও আপাতত পানি সরবরাহ রাখা হয়েছে। তবে রাজস্ব না আসায় ওয়াসা থেকে ঢোপকল সংস্কার করা হচ্ছে না। ধীরে ধীরে ঢোপকলগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে।’


এব্যাপারে রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহসান কবির লিটন সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘ঐতিহ্য কখনো জাদুঘরে রেখে সংরক্ষণ করা যায়না। ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হলে ঐতিহ্যের জায়গায় রেখে করতে হবে। এসব ঢোপকল থাকায় রিকসা চালক থেকে শুরু করে গরীর মানুষ অনেক উপকৃত হয়। তাছাড়া ঢোপকল রাজশাহীর বিরাট এক ঐতিহ্য। এগুলো না ভেঙ্গে সংস্কারের মাধ্যমে চালু রেখেও নগর উন্নয়ন করা যেতে পারে।’  

 

স/আর

 

পাঠকের মন্তব্য ( ০ )
Login